শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার তিন দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপের প্রভাব পড়বে মার্কিনদের খাদ্যাভ্যাসে। টমেটো ও অ্যাভোকাডোর মতো প্রতিদিন পাতে থাকা সবজির ক্ষেত্রে ক্রেতারা উচ্চ মূল্যের সম্মুখীন হতে পারেন। সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন বাণিজ্য নীতি অনুসরণ করছেন, যা তার বিজয়ের পর পরই ভোক্তাপণ্যের খরচ বাড়িয়ে তুলতে পারে। অথচ উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে হতাশা দেখিয়ে আসছিলেন দেশটির ভোটাররা। খবর এফটি ও সিএনএন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০১৭-২১ সালের শাসনামলকে অনুসরণ করেছে এবারের শুল্ক আরোপ। তবে দুই সময়ের পরিস্থিতি আলাদা। গত দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মাঝারি ধরনের মূল্যস্ফীতি ছিল। গত শনিবার আরোপিত শুল্কের মাত্রা আগের তুলনায় ব্যাপক, যা দেশটির খুচরা পর্যায়ে আঘাত হানতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ফল ও সবজির বৃহত্তম উৎস মেক্সিকো। কানাডা সবচেয়ে বড় শস্য, গবাদিপশু ও দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহকারী। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মেরি লাভলির মতে, আরোপিত শুল্ক বিশেষ করে গ্রোসারি ও নির্মাণসামগ্রীর ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের চাপ সৃষ্টি করবে। তবে এ বৃদ্ধি তাৎক্ষণিক হবে না। বরং ধীরে ধীরে সরবরাহ চেইনে ছড়িয়ে পড়বে।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের অধ্যাপক অমিত খান্ডেলওয়াল বলেন, ‘আমার ধারণা, খুচরা বিক্রেতারা স্বল্পমেয়াদে শুল্কের বোঝা সামলাতে পারে। তবে বিস্তৃত শুল্কের কারণে দাম বাড়বেই।’
চীন, মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য হিস্যা প্রায় ৪০ শতাংশ। দেশটিতে টমেটো ও অ্যাভোকাডোর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী মেক্সিকো ও কানাডা। ২০১৯-২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া ৯০ শতাংশ অ্যাভোকাডোর উৎস ছিল মেক্সিকো।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আয়োজন জাতীয় ফুটবল লিগ সুপার বোল। এ সময় ফুটবলপ্রেমীদের পছন্দের খাবার গুয়াকামোল। বিষয়টি উল্লেখ করে অমিত খান্ডেলওয়াল বলেন, ‘যখন কোনো পণ্যের উপযুক্ত বিকল্প থাকে না, তখন আপনি মূল্যবৃদ্ধির কষ্ট বেশি অনুভব করবেন। সুপার বোল সামনে, মানুষ গুয়াকামোল খেতে পছন্দ করে। এর উপযুক্ত বিকল্প না থাকলে দাম বাড়বে।’
চীন থেকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র, যা টেলিভিশন থেকে শুরু করে আইফোনের মতো জনপ্রিয় পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। এ নির্ভরশীলতাকে পাল্টা পদক্ষেপের অস্ত্র হিসেবে নিতে পারে চীন। জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক সিনা গোলারা বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না যে চীন অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তবে এটি সম্ভবত প্রতিশোধমূলক হবে এবং ভোক্তামূল্য আরো বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে।’
অবশ্য মার্কিন ডলারের সঙ্গে বিনিময় হারে মেক্সিকান পেসো ও কানাডিয়ান ডলারের দুর্বলতার কারণে শুল্কের প্রভাব কিছুটা কমতে পারে। এছাড়া মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে কানাডা থেকে আসা জ্বালানির ওপর অন্য পণ্যের তুলনায় কম ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, শুল্কের প্রভাব প্রথমে মূল্যস্ফীতিতে দেখা যাবে, যা পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলবে। ফলে ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করতে পারে। গত রোববার ক্লায়েন্টদের উদ্দেশ্যে এক নোটে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘যদি মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর ব্যাপক আকারে আরোপিত শুল্ক মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, তবে ফেড কিছু সময়ের জন্য নীরব থাকতে পারে।’
আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ কীভাবে ভোক্তাদের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আনে, তা এখন ফেড কর্মকর্তাদের বিবেচনায় থাকা মূল বিষয়। পরামর্শক সংস্থা ইওয়াইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো বলেন, ‘শুল্কের কারণে মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত আশঙ্কা বাড়লে ফেডকে দীর্ঘ সময়ের জন্য কঠোর আর্থিক নীতি বজায় রাখতে হতে পারে। এটি আর্থিক অবস্থাকে আরো কঠিন করে তুলবে এবং প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে।’
অবশ্য পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়াবে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে সরবরাহ চেইন ও ভোক্তা প্রতিক্রিয়া। এছাড়া কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো গেলে শুল্কের ক্ষতিকর প্রভাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই রোধ করা সম্ভব হতে পারে। তবুও এত বেশি শুল্ক এবং বিস্তৃত পণ্যের ওপর কার্যকর করা একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, যা ট্রাম্প প্রথম দফায়ও করেননি। এ প্রসঙ্গে আরএসএমের প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন আগুন নিয়ে খেলছে।’
এরই মধ্যে কানাডা সরকার ১ হাজার ২৫৬টি পণ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে, যা আজ থেকে প্রথম দফার প্রতিশোধমূলক শুল্কের আওতায় আসবে। এ তালিকায় রয়েছে পোলট্রি, দুগ্ধজাত পণ্য, তাজা ফল ও সবজি, টয়লেট পেপারের মতো কাঠ ও কাগজজাত দ্রব্য এবং ওয়াশিং মেশিন, পায়জামা ও হ্যান্ডব্যাগের মতো কিছু তৈরি পণ্য।
কানাডিয়ান মন্ত্রীরা আশা করছেন, ভোক্তারা আন্তর্জাতিক বা দেশীয় বিকল্প খুঁজে পাবেন এবং তারা আরো সুদূরপ্রসারী শুল্ক পদক্ষেপ নেবেন। প্রতিশোধমূলক শুল্কের তালিকা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রভাবশালী মার্কিন রফতানিকারকদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে ফ্লোরিডার কমলা জুস এবং সাউথ ক্যারোলাইনা ও ওহাইওতে তৈরি অ্যাপ্লায়েন্স।